তুরস্ক–বাংলাদেশ সম্পর্ক

তুরস্ক–বাংলাদেশ সম্পর্ক বাংলাদেশ এবং তুরস্কের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নির্দেশ করে। উভয় দেশই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, জাতিসংঘ এবং নিরপেক্ষ আন্দোলনের অংশ। উভয় দেশই গণতান্ত্রিক যারা পারিস্পারিক দৃঢ় সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ।

তুরস্ক–বাংলাদেশ সম্পর্ক

বাংলাদেশ

তুরস্ক

প্রাথমিক ইতিহাস

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্ব থেকেই তুর্কি এবং বাঙালি জাতির সম্পর্কের অত্যন্ত শক্তিশালী ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি রয়েছে। বাঙালিসহ দক্ষিণ এশিয়ার সকল মুসলিমগণ তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধে সমর্থন দিয়েছিল। বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২১ সালে তার রচিত "কামাল পাশা" নামক কবিতায় কামাল আতাতুর্কের প্রতি সম্মান ও প্রশংসা জ্ঞাপন করেন। এই কবিতাটি এক সময়ে বাংলাদেশের বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। পাশাপাশি, ঢাকা ও চট্টগ্রামের দুটি স্থানকে কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ নামে নামকরণ করা হয়। উপরন্তু, ফেনীতে আতাতুর্ক মডেল উচ্চ বিদ্যালয় এবং ঢাকায় মুস্তফা কামাল তুর্কি ভাষা কেন্দ্র নামে একটি ভাষা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অপরদিকে, তুর্কিগণও তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাঙালিদের সমর্থনকে এখনো শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। সবশেষে, ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরকে হজরত শাহজালালের নামানুসারে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে নামকরণ করা হয়, যিনি নিজেও একজন তুর্কি এবং তুর্কি সুফি পণ্ডিত জালালদ্দিন রুমির শিষ্য ছিলেন।[1]

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসির সম্মেলনে তুরস্ক বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৭৬ সালে ঢাকায় তুরস্কের দূতাবাস এবং ১৯৮১ সালে আঙ্কারায় বাংলাদেশের দূতাবাস প্রতিষ্ঠিত হয়।[1]

উচ্চ পর্যায়ে সফর

প্রাক্তন বাংলাদেশি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি সরকারপ্রধানদের মধ্যে সর্বপ্রথম আঙ্কারা সফর করেন। ১৯৮৬ সালে, তৎকালীন তুর্কি প্রধানমন্ত্রী তুরগুত ওজাল বাংলাদেশ সফরে আসেন।[2] তুর্কি রাষ্ট্রপতি সুলায়মান দেমিরেল ১৯৯৭ সালে নেলসন ম্যান্ডেলা এবং ইয়াসির আরাফাতের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ২৫ বছর পূর্তি উদযাপন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৯৮ সালে দুই দেশ সম্মিলিতভাবে ডি-৮ প্রতিষ্ঠা করে। তুর্কি প্রধানমন্ত্রী আব্দুল্লাহ গুল ২০১০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সফর করেন।[3] তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী রেসেপ তায়িপ এরদোয়ান ২০১০ সালে ঢাকা সফর করেন।[4][5] বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১২ সালে আঙ্কারা সফর করেন।[6]

প্রতিরক্ষা বিষয়ক সম্পর্ক

২০১৩ সালে তুরস্ক অটোকার কোবরা নামক হালকা অস্ত্রসজ্জিত যুদ্ধবাহন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে সরবরাহ করে।[7] ১৯৮১ সালের ১০ মার্চ ঢাকায় উভয় দেশ সামরিক প্রশিক্ষণ, শিক্ষা ও সেনাবাহিনীর যৌথ সহায়তার বিষয়ে একটি চুক্তি সাক্ষর করে। চুক্তি অনুসারে তুরস্কের বিশেষ নৌবাহিনী বাংলাদেশি নৌবাহিনীর বিশেষ দলকে স্পেশাল ওয়ারফেয়ার ডাইভিং অ্যান্ড স্যালভেজ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়।[8]

সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ও ইতিহাস

২০১৩ সালের ৩ মার্চ তুরস্কের ব্লকবাস্টার চলচ্চিত্র ফেতিহ ১৪৫৩ প্রথম তুর্কি চলচ্চিত্র হিসেবে বাংলাদেশের স্টার সিনেপ্লেক্স হলে মুক্তি পায়।[9] ২০১৪ সালে ঢাকার র‍্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেনে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং তুর্কি দূতাবাসের উদ্যোগে টার্কিশ ফুড ফেস্টিভালের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল দীপ্ত টিভি ২০১৫ সালের ১৮ই নভেম্বর থেকে তুরস্কের মুহতেশেম ইউজিয়েল নামক টিভি ধারাবাহিক প্রথম বাংলা ভাষায় ডাবিং করে সুলতান সুলেমান নামে সপ্তাহে ৬ দিনব্যাপী সাপ্তাহিক সম্প্রচার শুরু করে।[10][11] বাংলাদেশ এবং তুরস্ক উভয় দেশের সংস্কৃতিতেই গ্রিক এবং পারসিক ঐতিহ্যের প্রভাব রয়েছে। ১২০৩ খ্রিষ্টাব্দে তুর্কি বংশোদ্ভূত বাংলার প্রথম মুসলিম শাসক মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজি নদীয়া দখল করে বাংলায় মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তন করেন। এছাড়াও তুর্কিগণ বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় জুড়ে সুফি প্রভাব বিস্তারের জন্য সুপরিচিত যার ফলশ্রুতিতে পারসিক শাসনের পর তুর্কি শাসকগণ বাংলায় আগমন করেন।[12] এছাড়াও উসমানীয় সম্রাটগণ তৎকালীন বাংলার চট্টগ্রাম জেলাকে সমুদ্রবন্দর হিসেবে ব্যবহার করতেন।

তুরস্ক ও বাংলাদেশ উভয় দেশের সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক ইতিহাসে স্বাধীন ধর্মীয় বিশ্বাস, ইসলামি মূল্যবোধ এবং ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক চেতনার পারস্পরিক সহাবস্থান রয়েছে, পাশাপাশি রয়েছে এ সম্পর্কিত নানামুখী দ্বন্দ্ব ও বিরোধ। রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হলে ইসলাম সামাজিকভাবে সহাবস্থান করতে পারে না এই পূর্ব অভিজ্ঞতার ব্যপারে উক্ত উভয় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের জনগণের মাঝে বরাবরই বিস্মৃতি ও পুনরাবৃত্তি পরিলক্ষিত হয়। তুরস্কের গাজি পার্কে প্রস্তাবিত উন্নয়ন প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলন তুরস্কের ইসলামপন্থী সরকারের প্রতি তুরস্কের ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয়ের অপহরণকারী হিসেবে দোষারোপ করার পথকে প্রভাবিত করে। অপরদিকে বাংলাদেশে যুদ্ধপরাধীদের বিচার অল্প সময়ের মধ্যেই ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাংলাদেশের জন্য জনকল্যাণকর হিসেবে তুলে ধরে। এই উভয় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবে অসংযুক্ত মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে এই উভয় ঘটনাই ইসলামপন্থীদের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তাদের প্রচলিত রাজনৈতিক ইসলামকে উপযোগী পাশ্চাত্য দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী সংস্কার করে নিজেদের আধুনিকরূপে পরিচিতকরণের পারস্পরিক সাদৃশ্যপূর্ণ লক্ষ্যের প্রতি নির্দেশ করে।[13]

অর্থনৈতিক সম্পর্ক

বাংলাদেশ এবং তুরস্ক হল অন্যতম পারস্পারিক বাণিজ্যিক অংশীদার। এই দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক লেনদেন ১ বিলিয়ন ডলারেরও অধিক মূল্যমানের।[14] বাংলাদেশ থেকে প্রধানত পোশাক পণ্য তুরস্কে অধিক রপ্তানি করা হয়। ২০১২ সাল থেকে, বাংলাদেশ এবং তুরস্কের মাঝে মুক্ত বাণিজ্যিক চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চলছিল[15] কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নে তুরস্কের প্রবেশের আবেদন সংক্রান্ত জটিলতার কারণে চুক্তি সাক্ষর পিছিয়ে যায়।[16][17] এছাড়াও বাংলাদেশের জাহাজনির্মাণ শিল্প তুরস্কের বিনিয়োগের জন্য একটি আদর্শ সেক্টর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।[18]

২০১২ সালে বাংলাদেশ এবং তুরস্ক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের উপর একটি যৌথ খসড়া চুক্তিতে সাক্ষর করে। বাংলাদেশ-তুরস্ক যৌথ অর্থনৈতিক কমিশন দ্বিপাক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পন্থা বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনার জন্য নিয়মিতভাবে দ্বিবার্ষিক সভার আয়োজন করে চলেছে।[19]

তথ্যসূত্র

  1. "Turkey– Bangladesh Relations" (ইংরেজি ভাষায়)। http://www.mfa.gov.tr। আগস্ট ১৮, ২০১১। ২৫ মে ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৫ |প্রকাশক= এ বহিঃসংযোগ দেয়া (সাহায্য)
  2. "Bangladesh-Turkey ties: a close look" (ইংরেজি ভাষায়)। New Age। ২০১২-০৪-১৩। ২০১৪-০২-০১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৪-০১-২৫
  3. Muhammad Zamir (২০১০-০২-১৫)। "Consolidating Bangladesh-Turkey relations" (ইংরেজি ভাষায়)। The Daily Star। সংগ্রহের তারিখ ২০১৪-০১-২৫
  4. "PM ERDOĞAN MEETS BANGLADESHI PM SHEIKH HASINA WAJID"TRT English (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২৫ জানুয়ারি ২০১৪
  5. Harun ur Rashid (২০১০-১১-১৬)। "A new horizon of cooperation" (ইংরেজি ভাষায়)। The Daily Star। সংগ্রহের তারিখ ২০১৪-০১-২৫
  6. Diplomatic Correspondent (২০১২-০৪-১২)। "PM reaches Turkey" (ইংরেজি ভাষায়)। The Daily Star। সংগ্রহের তারিখ ২০১৪-০১-২৫
  7. "Army gets new SP guns, Metis M-1 missiles" (ইংরেজি ভাষায়)। natunbarta.com। ২০১৩-১২-২২। ২০১৩-১২-২৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৪-০১-২৫
  8. "List of agreement between Bangladesh and Turkey" (ইংরেজি ভাষায়)। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (বাংলাদেশ)। সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৫। সংগ্রহের তারিখ সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৫
  9. "স্টার সিনেপ্লেক্সে তুর্কী ছবি"দৈনিক প্রথম আলো। ৯ মার্চ ২০১৩। সংগ্রহের তারিখ ৬ এপ্রিল ২০১৫
  10. "দীপ্ত টিভিতে 'সুলতান সুলেমান"বাংলাদেশ প্রতিদিন। ১২ নভেম্বর ২০১৫। সংগ্রহের তারিখ ২৪ নভেম্বর ২০১৫
  11. "এসেছে দীপ্ত টিভি"প্রথম আলো। ১৮ নভেম্বর ২০১৫। সংগ্রহের তারিখ ২৪ নভেম্বর ২০১৫
  12. (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১৩-১২-২২ https://books.google.ca/books?id=gKhChF3yAOUC&pg=PA95&lpg=PA95&dq=turkish+rule+in+bengal&source=bl&ots=X55JqokR5O&sig=et-oW2Givqadj3Witm8TVSHBz04&hl=fr&sa=X&ei=dyyWVZzxCMqt-QGDo4SIAQ&ved=0CC0Q6AEwAg#v=onepage&q=turkish%20rule%20in%20bengal&f=false। সংগ্রহের তারিখ ২০১৫-০৭-০৩ |শিরোনাম= অনুপস্থিত বা খালি (সাহায্য)
  13. "Optimism for $10b Turkey-Bangla trade" (ইংরেজি ভাষায়)। https://www.opendemocracy.net। আগস্ট ১৭, ২০১৩। সংগ্রহের তারিখ সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৫ |প্রকাশক= এ বহিঃসংযোগ দেয়া (সাহায্য)
  14. "Optimism for b Turkey-Bangla trade" (ইংরেজি ভাষায়)। The Bangladesh Chronicle। ২০১৪-০২-০২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৪-০১-২৫
  15. Hafez Ahmed (২০১২-০৪-১৪)। "Dhaka, Ankara to sign FTA soon" (ইংরেজি ভাষায়)। The Financial Express। সংগ্রহের তারিখ ২০১৪-০১-২৫
  16. "Dhaka for FTA talks with Turkey" (ইংরেজি ভাষায়)। Dhaka Tribune। ২০১৩-১০-৩১। সংগ্রহের তারিখ ২০১৪-০১-২৫
  17. "Govt finalises draft framework of FTA with Turkey" (ইংরেজি ভাষায়)। New Age। ২০১৪-০২-০১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৪-০১-২৫
  18. "Marketing of Turkey-Bangladesh ties" (ইংরেজি ভাষায়)। New Age। ২০১২-০৪-২৫। ২০১৪-০২-০১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৪-০১-২৫
  19. Hafez Ahmed (২০১২-১১-১৩)। "Dhaka, Ankara to raise trade to $3bn by 2015" (ইংরেজি ভাষায়)। Daily Sun। সংগ্রহের তারিখ ২০১৪-০১-২৫
This article is issued from Wikipedia. The text is licensed under Creative Commons - Attribution - Sharealike. Additional terms may apply for the media files.