খেয়া
খেয়া বা ফেরী হল জলভাগের উপর একটি যাত্রী পরিবহন ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় যাত্রীবাহী ছোট জাহাজ যাত্রী পরিবহন করে পূর্বনির্ধারিত গন্তব্যে। অনেক সময় ফেরীরে পণ্য দ্রব্য পরিবহন করা হয়। ফেরী একটি নির্দিষ্ট পথে অনেক গুলি গন্তব্যে চলাচল করে। ফেরী প্রধানত অগভীর জলভাগ যেমন নদী, হ্রদ বা উপকূলভাগে চলাচল করে। অনেক সময় গভীর জলেও চলাচল করে। ফেরী পরিবহন জলভাগের উপর সেতু বা জলভাগের গভীরে সুড়ঙ্গ পথ তৈরির থেকে অনেক কম খরচ সাপেক্ষ। ফলে জলভাগে ফেরি অনেক লাভ জনক। বিষেশ তূমধ্যসাগরে উত্তর আফ্রিকা থেকে ইউরোপে চলাচলের জন্য সেতু বা সুড়ঙ্গ অপেক্ষা ফেরী অনেক কার্যকরী।


ইতালির ভেনিসে জলপথে যাত্রী পরিবহনকারী ফেরী বা ছোট জাহাজ গুলিকে ওয়াটার বাস বা ওয়াটার ট্রাক্সি বলা হয়।
ইতিহাস
গ্রীক সভ্যাতার সময় থেকেই ফেরী চলাচল গতি পায়। এই সময় প্রধান মানুষ ফেরি করেই চালচল করত উপকূল ভাগে ও দ্বীপে। এর পর বিভিন্ন সময় ফেরী ব্যবস্থা ও জলযান গুলি উন্নত হয়েছে।
বিশ্বের কিছু বিখ্যাত ফেরী
এশিয়া
হংকং শহরে ফেরী ব্যবস্থা খুবই পুরোনো। এই দ্বীপ শহর থেকে ফেরী চিনের মূল ভূখন্ডে ও পার্শবরতী দ্বীপে চলাচল করে। চিনের সাংহাই শহরেও রয়েছে সুসংগঠিত ফেরী ব্যবস্থা।
ভারতের প্রাক্তন রাজধানী ও ভারতের সংস্কৃতির রাজধানী কলকাতায় রয়েছে বিশ্বের প্রচীন ফেরী ব্যবস্থাগুলির একটি। কলকাতা থেকে হাওড়া ফেরী চলাচল করে সবচেয় বেশি। এছাড়াও কলকাতা থেকে বালি, বেলুরমঠ, দক্ষিণেশ্বর প্রভৃতি স্থানে ফেরি চলাচল করে।[1] কলকাতা থেকে উত্তর প্রদেশের বারানসি পর্যন্ত একটি ফেরী চালু রয়েছে। এছাড়া ভারতের মুম্বাই শহরে রয়ে ফেরী ব্যবস্থা। এই শহরের ফেরী গুলি উপকূল ভাগে চলাচল করে। কেরালার অভ্যান্তরীন জলভাগে একটি ফেরী ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এই ব্যবস্থাটি পরিচালনা করে কেরালা রাষ্ট্রিয় জলপথ পরিবহন পর্ষদ।
বাংলাদেশের ঢাকা শহরের সঙ্গে চাঁদপুর, বরিশাল, নারায়নগঞ্জ প্রভৃতি এলাকার সঙ্গে ফেরী চালু রয়েছে। জাপানেও ফেরী ব্যবস্থা চালু রয়েছে টোকিও শহরে।দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মালেশিয়া ফেরী চলাচল করে।
আফ্রিকা
আফ্রিকার মেরিন সার্ভিস কোম্পানি যাত্রী পরিবহনের একটি পরিকল্প নিয়েছে আফ্রিকার তিনটি বৃহত্ত হ্রদে। এই তিনটি হ্রদ হল - ভিক্টোরিয়া হ্রদ, তানজেনিয়া হ্রদ ও নায়াসা হ্রদ। এই এলাকায় এই ফেরি সংস্থাটি জার্মান উপনিবেশের সময় ১৯১৩ সাল থেকে ফেরী ব্যবস্থা পরিচালনা করছে।
ইউরোপ

ইউরোপ এর ইংলিশ চ্যানেল হল বিশ্বের ব্যস্ততম জলপথ। এই পথে ব্রিটেন যুক্ত হয় ইউরোপের মূল ভূখন্ডের সঙ্গে। এই থপে ফ্রান্সের বহু বন্দর রয়েছে। এছাড়া ব্রিটেন এই পথে জার্মান, নেদারল্যান্ড প্রভৃতি দেশে ফেরী পরিচালনা করে। পথটি প্রধানত পণ্য পরিবহন ফেরী চালু করে। তবে বহু পর্যটক বহনকারী ফেরী এই পথে চলে।

বাল্টিক সাগরকে কেন্দ্র করে রাশিয়া, সুইডেন, ফিনল্যান প্রভৃতি এই সাগরের তীরবর্তী দেশের মধ্যে খেয়া ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এমনকি ইটালি, গ্রীস ও স্পেন থেকে খেয়া চলাচল করে এই সাগর তীরের দেশ গুলির মধ্যে। তবেই এই খেয়ার বেশিরাগই পর্যটরা চলাচল করে অনেক সময় এই খেয়াতে গাড়ি রপ্তানী নয়।
ইউররোপের আমস্টারডাম শহরে খেয়া চলাচল করে শহরের খাল পথে।
উত্তর আমেরিকা

কানাডাতে রয়েছে বেশ কিছু সুপিরিয় জল বা সাধু জলের হ্রদ। ফলে এই হ্রদ ও হ্রদ থেকে উৎপন্ন নদী গুলিতে ফেরী বা খেয়া চলাচল করে। কানাডার ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে অবস্থিত পঞ্চ হ্রদ। এই হ্রদে খেয়া পরিসেবা রয়েছে। তবে উত্তর আমেরিকার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখ যোগ্য খেয়া রয়েছে নিউ ইয়াক শহরে। এই শহরের ম্যানহাটান ও স্টেইন আইল্যান্ড এর মধ্যে। এই শহরে হাডসন নদীতে খেয়া চলাচল করে। নিউ জর্জিয়া শহরেও খেয়া বা ফেরী ব্যবস্থা রয়েছে।
নিউ অর্লিন্সের এলাকায় এছাড়াও অনেক ফেরি যানবাহন ও পথচারীরা উভয় বহন করে। সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য আলজিয়ার্স ফেরি । এই পরিষেবাটি একটানা ১৮১৭ সাল থেকে ও উত্তর আমেরিকা প্রাচীনতম ফেরি পরিচালনা করছে।নিউ ইংল্যান্ড ইন, গাড়ি-বহনকারী মূল ভূখন্ড কেপ কড এবং মার্থা এর মার্থান ভিনএয়াড এবং নানটুকেট আমরা দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে ফেরি উডস হোল, মার্থা এর দ্রাক্ষাক্ষেত্র এবং নানটুকেট বাষ্পচালিত জাহাজ কর্তৃপক্ষ, যা সেইসাথে উডস হোল এবং ভিনেয়ার্ড হ্যাভেন মধ্যে বর্ষব্যাপী পরিচালিত হয় । মৌসুমি সেবা এছাড়াও শ্রম দিবসে ওএক ব্লোফস ও উডস হোল থেকে পরিচালিত হয়। সেখানে, উপরন্তু বাষ্পচালিত জাহাজ কর্তৃপক্ষ ফেরি বা দ্বীপ থেকে ব্যক্তিগত গাড়ি পরিবহনের কেবল পদ্ধতি হচ্ছে কোন সেতু বা মূল ভূখন্ড থেকে দ্বীপ সংযোগ টানেল আছেন, একমাত্র লিংক হিসেবে কাজ করে যা ভারী মালবাহী এবং এই ধরনের খাবারের সরবরাহ দ্বারা এবং পেট্রল দ্বীপপুঞ্জ ট্রাকে করা যেতে পারে। উপরন্তু, হয়-লাইন ক্রুজ উভয় দ্বীপপুঞ্জ থেকে উচ্চ গতির কলহপ্রি়া সেবা, সেইসাথে ঐতিহ্যগত ফেরি, এবং বেশ কিছু ছোট ফেরি চালানো হয় মৌসুমি যাত্রী কেবল পরিষেবা প্রাথমিকভাবে নিউ বেডফোর্ড, সহ অন্যান্য মূল ভূখন্ড পোর্ট থেকে পর্যটক দিনের আসা যাওয়া গতি বাড়ানোর (নিউ পরিচালনা বেডফোর্ড ফাস্ট ফেরি) ফালমাউথ, (দ্বীপ রানী খেয়া এবং ফালমাউত ফেরি) এবং হারউইচ, (ফ্রিডম ক্রুজ লাইন)। ফেরি এছাড়াও মধ্যে ব্রিজপোর্ট এবং নিউ লন্ডন, এবং লং আইল্যান্ডের উপর পয়েন্ট থেকে রোড আইল্যান্ড ব্লক দ্বীপ যেমন কানেকটিকাট শহরে লং আইল্যান্ডের সাউন্ড জুড়ে রাইডার্স ও যানবাহন নিয়ে আসে।
ওশেনিয়া

অস্ট্রেলিয়ার তাসমেনিয়া দ্বীপের সঙ্গে মূল ভূখন্ডের মধ্যে ফেরী চলাচল করে। এই পথের দৈর্ঘ্য ৩০০ কিমি। এই পথে ফেরী রাত ও দিনে উভয় সময়ে চালচল করে। তাসমানিয়া দ্বীপের বন্দর শহর ডেভোনপোর্ট ও মূলভূখন্ডের মেলবর্ন এর মধ্যে এই ফেরী চালাচল করে।
নিউজারল্যান্ড এর উত্র দ্বীপের ওয়েলিংটন ও দক্ষিণ দ্বীপের পিকটন শহরের মধ্যে ৯২ কিমি দীর্ঘ জলপথে ফেরী চলাচল করে। এই পথে এটি সংস্থা ফেরী পরিচালনা করে। এর মধ্যে একটি সরকারি সংস্থা - ইন্টেরিওল্যান্ডার।
ধরন
ফেরী বিভিন্ন ধরনের হয় ফেরীগুলি বিভিন্ন কার্যে ব্যবহৃত হয়।
ডাবোল-এন্ডেট

ডাবোল-এন্ড বা দ্বি-প্রান্ত ফেরি হল এমন এক ফেরি ব্যবস্থা যেখানে জাহাজ গুলিকে বিপরীত গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার জন্য জাহাজ ঘোরানোর প্রয়োজন নেই। জাহাজগুলি দুই দিকেই চলতে পাড়ে। এই ফেরি ব্যবস্থা রয়েছে স্টেটেন আইল্যান্ড ফেরী, ওয়াশিংটন ফেরী, স্টার ফেরী, নর্থ ক্যারলাইনা ফেরি। অস্ট্রিলিয়ার সিডনিতে এই ফেরি চালু হয়েছে।২০০৮ সালে চালু হওয়া বিসি ফেরী তিনটি বিশ্বের মধ্যে বৃহত্তম ডাবোল-ওন্ড ফেরী ব্যবস্থা।
হোভারক্রাফট
হোভারক্রাফটের উন্নয়ন হয় প্রধানত ১৯৬০-১৯৯০ সালে। বিশ্বের বৃহত্তম হোভারক্রাফ্ট হল এসআর এন৪। এটি ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে চলাচল করে। হোভারক্রাফট ক্যাটামেরিন থেকে দ্রত ও কম খরচ সাপেক্ষ।এটি সমুদ্রের মধ্যে ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় সহজে চলাচল করে।পোর্টমাউত থেকে ইসলে অফ ওয়েট পর্যন্ত একটি পথ যাত্রীদের জন্য হোভার পরিসেবা রয়েছে।
ক্যাটামারেন
ক্যাটামেরিন ব্যবহৃত হয় দ্রুত পরিসেবার জন্য ।স্টেন লাইন বিশ্বের বিহত্তম ক্যাটামেরিন প্ররিসেবা প্রদানকারী সংস্থা।ওই সংস্থার স্টেন এইচএসএস ক্লাস ফেরি ইউনাইটেট কিংডম ও আয়ারল্যান্ডের মধ্যে চলাচল করে।ক্যাটামেরিন গুলিম মধ্যে ওয়াটারজেট এর ১৯,৬৩৮ টন ওজনের ক্যাটামেরিন ৩৭৫ টি যাত্রীবাহি গাড়ি ও ১,৫০০ জন যাত্রী পরিবহন করতে পারে।ব্রিটেনি ফেরি নরম্যান্ডি এক্সপ্রেস ও নর্ম্যান্ডি ভিটেনি পরিচালনা করে।
রোল অন/রোল অফ
রোল-অন / রোল অফ বৃহৎ প্রচলিত বাহু যার দ্বারা যানবাহন বোর্ড এবং চলে যাবে নামকরণ ।
পনটোন ফেরী
এই ফেরী প্রধানত ব্যবহতৃত হয় কম উন্নত দেশে নদী বা দীর্ঘ জলপথে গাড়ি পাড়াপারে।প্রথমে ফেরী যানটি র্যাম্প জেটিতে যুক্ত করে এর পর গাড়ি চালক গাড়ি চালিয়ে পেরীতে উঠে।ফেরীটি এর পর নির্দিষ্ট গন্তব্যে চলে যায়।
ট্রেন ফেরি
এই সমস্ত ফেরীতে ব্যবহারকারী জাহাজে ট্রেন ও তার যন্ত্রপাতি ব্যবহারে ব্যবস্থা থাকে এই ফেরী সমুদ্র পথে বিভিন্ন দেশে ট্রেন পরিবহন করে।
ঘূর্নন ফেরী

এই ফেরীতে মালপত্র পাশথেকে তোলা হয়। ফেরীর উপরের অংশ ডেকে উঠে আসে পণ্য তোলার জন্য। এর পর উপরের অংশ ফেরির নীচের অংশের সঙ্গে একই সরল রেখায় আসে এবং গন্তব্যে যাত্রা শুরু করে।
বায়ু খেয়া
১৯৫০-১৯৬০ সালে যায়ু খেয়া বা ফেরী শুরু হয়।এই ফেরীতে উরজাহাজ বা বিমান ব্যবহার করা হয়।এই খেয়ায় সহজে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্য পাঠানো যায়।এই খেয়ার প্রধান সংস্থা গুলি হল-চ্যানেল এয়ার ব্রিজ, সিলভার সিটি এয়ারওয়েজ এবংকোরসায়ার
ফুট বা পদ ফেরী
এই ফেরী দেখা যায় ইউরোপের বেলজিয়ামে।এছরা চেক প্রজাতন্ত্র ও নেদারল্যন্ডেও দেখা যায়।নিউ ইয়ারক শহরের রয়েছে ফুট ফেরী।
কেবল বা তার ফেরি

এই ফেরী ব্যবহৃত হয় খুব কম দূরত্বের জল পথে।জল ভাগের এক তীরে ফেরী থাকে অন্য পাশে কেবল বা তার থেকে ফের সঙ্গে যুক্ত।এই তার টানে ফেরিকে অন্য পারে নেওয়া হয়।এই ভাবে গাড়ি ও পণ্য পরিবহন করা হয়। সুজারল্যান্ডে এই ধরনের ফেরী দেখা যায়।[3]
ডকিং

ফেরী জাহাজ গুলিকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নির্মাণ করা হয়।জাহাজ গুলি যাতে সহজেই যাত্রী ও পণ্য ডক থেকে উঠানো নামাতে পাড়ে।বিশিষ করে ট্রেন ও গাড়ি পরিবহনের ফেরী জাহাজ গুলি নির্মাণের সময় এই সমস্ত জাহাজে র্যাম্প যুক্ত করা হয়।
দূর্ঘটনা
ফেরী চলাচলে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দূর্ঘটনা ঘটেছে।
- এমএস এসটোনিয়া – ৮৫২ জনের মৃত্যু।
- MS Herald of Free Enterprise – ১৯৩ জনের মৃত্যু।
- MS Scandinavian Star – ১৫৯ জনের মৃত্যু।
- MV Doña Paz – ৪৩৮৬ জনের মৃত্যু।
- MV Sewol – ৩০৪ জনের মৃত্যু।
- টিইভি ওহিনি ; ৫৩ জনের মৃত্যু।
তথ্যসূত্র
- "হুগলী ও নদীয়ার সঙ্গে জলপথে কলকাতার যোগাযোগ আরও উন্নত হবে : শুভেন্দু অধিকারী"।
- http://www.bcferries.com/files/AboutBCF/AR/BCFS_AnnualReport_2015-2016.pdf
- "Faeri Verein Basel"। ৬ জুলাই ২০১১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৪ মার্চ ২০১৭।