হাইপোথাইরয়েডিজম

হাইপোথাইরয়েডিজম মানুষ ও পশুর একটি রোগ যা থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে উৎপাদিত থাইরয়েড হরমোনের উৎপাদনের স্বল্পতার কারণে হয়ে থাকে। শিশুদের মধ্যে থাইরয়েড হরমোন

হাইপোথাইরয়েডিজম
থাইরক্সিন (T4) সাধারণত ২০:১ অনুপাতে ট্রাইআয়োডোথাইরোনিন (T3) উৎপন্ন করে
শ্রেণীবিভাগ এবং বহিঃস্থ সম্পদ
বিশিষ্টতাendocrinology[*]
আইসিডি-১০E০৩.৯
আইসিডি-৯-সিএম২৪৪.৯
ডিজিসেসডিবি৬৫৫৮
ইমেডিসিনmed/1145
পেশেন্ট ইউকেহাইপোথাইরয়েডিজম
মেএসএইচD০০৭০৩৭ (ইংরেজি)

জন্মগত অভাবজনিত বামনত্ব, পেশীকাঠিন্য ও মানসিক জড়তা হলে তাকে ক্রেটিনিজম বলে।

থাইরয়েড হরমোন তৈরীর জন্য আয়োডিন লাগে, এবং সারা দুনিয়ার পরিসংখ্যানে আয়োডিনের অভাবই হাইপোথাইরয়েডিজমের সর্বপ্রধান কারণ। এমন একটি কারণ যা দূর করা কঠিন নয়। অথচ এখনো এই দূরণীয় কারণের প্রকোপ পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ শিশুর মানসিক জড়তা ঘটিয়ে চলেছে। আয়োডিনের অভাবই প্রধান কারণ হলেও হাইপোথাইরয়েডিজমের একমাত্র কারণ নয়। নানান কারণে থাইরয়েড গ্রন্থিতে হর্মোন উৎপাদনের অভাব হতে পারে, যার পরিণাম সাময়িক অথবা স্থায়ী হতে পারে। যেমন হাইপারথাইরয়েডিজমের ট্রিটমেন্ট করবার সময় তেজস্ক্রীয় আয়োডিন-১৩১ প্রয়োগ করা হয় যা থাইরয়েড গ্রন্থিতে জমা হয় ও থাইরয়েড গ্রন্থির তীব্র ক্ষতি করে যার স্থায়ী ফল হিসাবে আয়াট্রোজেনিক (অর্থাৎ ঔষধজনিত বা চিকিৎসাঘটিত) হাইপোথাইরয়েডিজম ঘটে এবং তখন বাকী সারা জীবন এই রোগীদের থাইরয়েড হর্মোন ওষুধ হিসাবে খেতে হয়।

কারণ

সাধারণ জনসংখ্যার প্রায় তিন শতাংশ হাইপোথাইরয়েড।[1] খাবারে আয়োডিনের স্বল্পতা হাইপোথাইরয়েড হবার একটি বড় কারণ। হাইপোথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত হবার বেশকিছু কারণ আছে। ইতিহাস বলে, এবং এখনো অনেক উন্নয়নশীল দেশে, আয়োডিন স্বল্পতাকেই বিশ্বজুড়ে হাইপোথাইরয়েডিজমের সবচেয়ে সাধারণ কারণ। আয়োডিনের স্বল্পতা ছাড়াও হাশিমোতোর থাইরয়েডিটিস বা থাইরয়েড গ্রন্থির এক প্রকার প্রদাহ (ইনফ্ল্যামেশন), অথবা হাইপোথ্যালামাস বা পিটুইটারি গ্রন্থির থেকে নিসৃত থাইরয়েড স্টিম্যুলেটিং হর্মোনের স্বল্পতাও এই রোগের কারণ হতে পারে। গর্ভধারণের সময় দেহের মেটাবলিজম বৃদ্ধির কারণে থাইরয়েড হর্মোনের প্রয়োজন এত বেশি বৃদ্ধি পায় যে সাময়িক ভাবে থাইরয়েড হর্মোন কম পড়তে পারে যা জন্মদানের পর আপনি ঠিক হয়ে যেতে পারে। তবে কারো যদি আগে থেকেই মৃদু হাইপোথাইরয়েডিজম থাকে তাহলে তা আরো প্রকট হয়ে পড়তে পারে। পোস্টপার্টাম থাইরয়েডিটিজ থেকেও হাইপোথাইরয়েডিজম হতে পারে। দেখা যায় যে, সন্তান জন্মদানের পর এক বছরের মধ্যে প্রায় পাঁচ শতাংশ মহিলা পোস্টপার্টাম (অর্থাৎ জন্মদান পরবর্তী) থাইরয়েডিটিসে আক্রান্ত হন। থাইরয়ডাইটিসের প্রথম দশায় থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে খুব বেশি বেগে হর্মোন নিসৃত হয়ে হাইপারথাইরয়েডিজম ঘটাতে পারে। এরপর দুটি ব্যাপার ঘটতে পারে; মহিলাটির থাইরয়েড স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারে বা তিনি হাইপোথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত হতে পারেন। যে সকল মহিলা পোস্টপার্টাম থাইরয়েডিটিজের মাধ্যমে হাইপোথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত হন, তাদের মধ্যে গড়ে পাঁচ জনের মধ্যে একজন স্থায়ী হাইপোথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত হন এবং বাকি জীবন তাদের চিকিৎসাসেবার প্রয়োজন হয়।

অস্থায়ী হাইপোথাইরয়েডিজমের আরেকটি কারণ হতে পারে ওলফ-চেইকোফ ইফেক্ট যাতে খুব বেশি আয়োডিনের প্রভাবে থাইরয়েড গ্রন্থির মধ্যে থাইরোগ্লোব্যুলিনের সংগে আয়োডিন সংযোগ হবার (আয়োডিন আত্তিকরণ) ধাপটিতে অসুবিধা হতে পারে। এজন্য হাইপোথাইরয়েডিজমের চিকিৎসায় প্রাথমিকভাবে খুবই অল্প বিশুদ্ধ আয়োডিন ব্যবহৃত হতে পারে, বিশেষ করে কেবল জরুরি অবস্থায়।

রোগ যে প্রত্যঙ্গ থেকে উৎপন্ন হয় তার ওপর ভিত্তি করে হাইপোথাইরয়েডিজমকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়:[2][3]

প্রকারউৎপত্তিবর্ণনা
প্রাথমিকথাইরয়েড গ্রন্থিসবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো হাশিমোতোর থাইরয়েডিটিস (একটি অটোইমিউন রোগ) এবং হাইপারথাইরয়েডিজমের জন্য রেডিওআয়োডিন থেরাপি।
মাধ্যমিকপিটুইটারি গ্রন্থিএটা হয় যখন পিটুইটারি গ্রন্থি পর্যাপ্ত পরিমাণ থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন (TSH) উৎপন্ন করতে ব্যর্থ হয়, যা থাইরয়েড গ্রন্থিকে প্রয়োজনীয় থাইরক্সিন ও ট্রাইআয়োডোথাইরোনিন উৎপন্ন হতে সাহায্য করে। যদিও সেকেন্ডারি হাইপোথাইরয়েডিজমের কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ নেই, তবুও সাধারণত টিউমার, রেডিয়েশন বা শল্যচিকিৎসার কারণে পিটুইটারি গ্রন্থি কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হলে সেকেন্ডারি হাইপোথাইরয়েডিজম হতে পারে।[4]
টারশিয়ারিহাইপোথ্যালামাসএটা ঘটে যখন হাইপোথ্যালামাস পর্যাপ্ত পরিমাণ থাইরোট্রপিন রিলিজিং হরমোন (TRH) উৎপন্ন করতে ব্যর্থ হয়। পিটুইটারি থাইরোট্রপিন (TSH) উৎপাদনে ভূমিকা রাখে। এটাকে হাইপোথ্যালামিক-পিটুইটারি-অ্যাক্সিস-হাইপোথাইরয়েডিজম বলে।

রোগের লক্ষণ

প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে হাইপোথাইরয়েডিজমের নিম্নোক্ত লক্ষণগুলো দেখা যায়।[4][5][6]

প্রাথমিক লক্ষণ

  • ঠাণ্ডা সহ্য করতে না পারা, ঠাণ্ডার প্রতি স্পর্শকাতরতা বৃদ্ধি পায়।
  • ওজনবৃদ্ধি, এমনকি কম খেলেও।
  • শরীরে আন্তঃকোষীয় কলা বৃদ্ধি ও পানি জমা শুরু।
  • ব্রাডিকার্ডিয়া (নাড়ির গতি হ্রাস পাওয়া—স্পন্দন মিনিটে ষাট বারেরও কম হয়)
  • ঘামের পরিমাণ হ্রাস পাওয়া
  • ত্বকের শুষ্কতা ও চুলকানি প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া
  • পেশিতে হালকা ব্যাথা বা ক্রাম্প - প্রধানতঃ মাসল হাইপোটোনিয়া বা শৈথিল্যের কারণে।
  • দৈহিক অবসাদ বা অস্বস্তি এবং সারা দেহে এবং অস্থিসন্ধিতে (অর্থাৎ গাঁটে) ব্যাথা ।
  • বিষণ্ণতা বা মানসিক অবসাদগ্রস্থতা যাকে সিউডো-ডিপ্রেশন বলা হয়।
  • গলগণ্ড থাকতে পারে, বা নাও থাকতে পারে।
  • চিকন, ভঙ্গুর আঙ্গুলের নখ
  • চিকন, ভঙ্গুর চুল, বেশী চুল পড়া
  • মলিনতা
  • কোষ্ঠকাঠিন্য
  • রজঃস্রাব প্রাথমিক দশায় বৃদ্ধি পেতে পারে।

বিলম্বিত লক্ষণ

  • শরীরে আন্তঃকোষীয় কলা বৃদ্ধি ও পানি জমার জন্য এমনকি কার্পাল টানেল সিনড্রোম পর্যন্ত হতে পারে।
  • মিক্সিডিমা অর্থাৎ আন্তঃকোষীয় লসিকার মধ্যে শ্লেষ্মার মত (মিক্সয়েড) পদার্থ জমা হয়ে ইডিমা যার উপরে চাপ দিলেও তা সরে গিয়ে পিটিং বা গর্ত তৈরী হতে দেয় না।
  • ত্বক শুষ্ক এবং ফুলে যায়, বিশেষ করে মুখ
  • স্বরতন্ত্রীর স্ফীতির জন্য স্বর ভেঙে গিয়ে ভারি হয়ে যায়।
  • চিন্তাধারার গতি স্লথ হয়ে যায়।
  • দুই কারণেই কথা ধীরে ধীরে বলতে হয়।
  • চোখের ভ্রু চিকন হতে শুরু করে এবং ভ্রর বাইরের অংশ প্রায় মুছে যায় (ম্যাডারোসিস)।
  • রজঃচক্র অনিয়মিত হয়ে পড়ে
  • শরীর তাপমাত্রা হ্রাস পায়

অ-সাধারণ লক্ষণাদি

  • স্মৃতি শক্তির অবক্ষয়
  • অমনোযোগ
  • ধীরতর হৃদস্পন্দন
  • টাক পড়া
  • ত্বক বাদামী হওয়া
  • ধীর স্নায়বিক রিফ্লেক্স
  • গলধঃকরণের সমস্যা
  • অস্থির মেজাজ
  • যৌনউত্তেজনার হ্রাস
  • ঘ্রাণশক্তির হ্রাস
  • মিক্সিডিমা কোমা

রোগ নির্ণায়ক পরীক্ষাদি

প্রাথমিক বা প্রাইমারি হাইপোথাইরয়েডিজম নির্ণয়ে বেশিরভাগ ডাক্তার সাধারণত পিউটুইটারি গ্রন্থি থেকে উৎপন্ন থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোনের (TSH) পরিমাণ পরিমাপ করেন। TSH–এর উচ্চমাত্রা নির্দেশ করে যে থাইরয়েড গ্রন্থি যথেষ্ট পরিমাণে থাইরয়েড হরমোন উৎপাদন করছে না (প্রধানত থাইরক্সিন (T4) এবং অল্প পরিমাণ ট্রাইআয়োডোথাইরোনিন (T3))। কিন্তু সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারি হাইপোথাইরয়েডিজম TSH পরিমাপের দ্বারা নির্ণয় করা যায় না। TSH এর পরিমাণ স্বাভাবিক থাকলেও হাইপোথাইরয়েডিজম নির্ণয় করা যেতে পারে এবং সেজন্য যে রক্ত পরীক্ষাগুলো করাতে পরামর্শ দেয়া হয়, তা হলো:

  • মুক্ত ট্রাইআয়োডোথাইরোনিন (free T3)
  • মুক্ত থাইরক্সিন (free T4)
  • সমস্ত (অর্থাৎ মুক্ত ও প্রোটিনে যুক্ত) ট্রাইআয়োডোথাইরোনিন (Total T3)
  • সমস্ত (অর্থাৎ মুক্ত ও প্রোটিনে যুক্ত) থাইরক্সিন (Total T4)

এছাড়া আরো বিশেষ কয়েকটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

  1. Jack DeRuiter (২০০২)। Thyroid Pathology (PDF)। পৃষ্ঠা 30।
  2. Simon H (২০০৬-০৪-১৯)। "Hypothyroidism"। University of Maryland Medical Center। সংগ্রহের তারিখ ২০০৮-০২-২৮
  3. Department of Pathology (June 13, 2005)। "Pituitary Gland -- Diseases/Syndromes"। Virginia Commonwealth University (VCU)। সংগ্রহের তারিখ 2008-02-28 এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ= (সাহায্য)
  4. American Thyroid Association (ATA) (২০০৩)। Hypothyroidism Booklet (PDF)। পৃষ্ঠা 6। ৭ এপ্রিল ২০০৯ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৭ জুলাই ২০০৯
  5. মেডিলাইনপ্লাস বিশ্বকোষ Hypothyroidism — primary — see list of Symptoms
  6. "Hypothyroidism — In-Depth Report." The New York Times. Copyright 2008

বহিঃসংযোগ

This article is issued from Wikipedia. The text is licensed under Creative Commons - Attribution - Sharealike. Additional terms may apply for the media files.