উত্তর আফ্রিকার ইতিহাস

ইসলাম আগমনের পর গোড়ার দিকে মিশর, সিরিয়া, ইরাক এবং পারস্য বিজয়ের সৈন্য এবং নেতারা ছিলেন মুসলিমদের ১ম প্রজন্ম। এমনকি তাদের মধ্যে অনেকে রাসূল (সাঃ) এর সাহাবীও ছিলেন। এখন প্রশ্ন আসে, পরবর্তী প্রজন্মে যখন মুসলিমদের বিস্তার অব্যাহত থাকে সুদূর-পশ্চিমে, উত্তর আফ্রিকায়, এবং এরও পরে স্পেনে, তখন কি হয়েছিল?

৭ম শতকের দিকে উত্তর আফ্রিকার উপকূলে ছিল বার্বার জাতিগোষ্ঠীর বসবাস। মিশর থেকে আলজেরিয়া পর্যন্ত গোটা উপকূলীয় অঞ্চল বাইজেন্টাইনদের অধীনে থাকলেও এ অঞ্চলের জনগণ তাদের অনুগত ছিলনা। তাদের দমিয়ে রাখতে বাইজেন্টাইনদের অনেক ঝামেলা পোহাতে হচ্ছিল। ইসলামের আবির্ভাবের আগের শতাব্দীতে অঞ্চলটির রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিপর্যয় একে বিধ্বস্ত অঞ্চলে পরিণত করে। অবস্থাটা ছিল এক সময়ের গৌরবময় প্রদেশের একটি কঙ্কাল মাত্র।

প্রথম উমাইয়া খলিফা মুয়াবিয়া (রাঃ) উত্তর আফ্রিকার উপকূল জয়ের জন্য উকবা বিন নাফি কে সেনাপ্রধান নিযুক্ত করেন। কয়েক দশকের মাঝেই উত্তর আফ্রিকায় মুসলিমদের শক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়। যুদ্ধের বিস্তারিত কৌশলের আলোকপাত এখানে আর করা হলোনা।

দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়াতে আমরা যে উদাহরণ দেখেছিলাম উত্তর আফ্রিকার ক্ষেত্রেও তাই ঘটে। কোন স্থানীয় অধিবাসীকে ধর্মান্তরে বাধ্য করা হয়নি। মুসলিম কিংবা অমুসলিম কোন সূত্রেই বার্বারদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরের ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়না। প্রকৃতপক্ষে, বেশীরভাগ বার্বার অনেক দ্রুত ইসলাম গ্রহণ করে। গোটা মহাদেশজুড়ে ব্যাপক আকারে বার্বারদের ইসলাম গ্রহণ এবং সেনাবাহিনীতে যোগদানের ফলে মুসলিমদের শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই বার্বার জনগোষ্ঠীকে যদি জোরপূর্বক ধর্মান্তর করানো হতো, তবে নিশ্চিতভাবেই ইসলামের জন্য তাদের এই আগ্রহ ও উদ্দীপনা থাকতোনা। এই আগ্রহ ও উদ্দীপনাই তাদের মুসলিম বাহিনীতে যোগদানের পিছনে মূল কারণ ছিল এবং যা সম্ভব করেছিল ইসলামের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরো বিস্তৃত করার, এমনকি বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধেও।

মুসলিমদের উত্তর আফ্রিকা জয়ের পর এমন এক প্রস্তাব এসেছিল যা সমগ্র বিশ্বের ইতিহাসের গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন করে দেয়। ৮ম শতকের শুরুর দিকে আইবেরিয়া উপদ্বীপ (বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল) ছিল ভিসিগোথিক রাজা রডারিক এর শাসনাধীন। তখন আইবেরিয়ার এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি উত্তর আফ্রিকায় মুসলিম গভর্নরের সাথে দেখা করতে যান এবং রডারিকের নির্মম অত্যাচারী শাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। তিনি এই প্রতিশ্রুতিও দেন যে, রডারিকের বিরুদ্ধে যদি মুসলিমরা অভিযান চালায় তবে তিনি নিজ সৈন্যবাহিনীর মাধ্যমে মুসলিমদের সহায়তা করবেন।

জিব্রাল্টার। এখানেই তারিক বিন জিয়াদের বাহিনী মরক্কো থেকে এসে পৌঁছায় রডারিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের পূর্বে। ছবিতে বর্তমান সময়ের একটি মসজিদ দেখা যাচ্ছে।

শুরুর দিকে কিছু ছোটখাট আক্রমণের মাধ্যমে স্থানীয়দের সমর্থন কেমন হবে তা আন্দাজ করার চেষ্টা করলেন মুসলিম জেনারেল তারিক বিন জিয়াদ (যিনি খুব সম্ভবত বার্বার জাতিগোষ্ঠীর ছিলেন)। এরপর তিনি মরক্কো থেকে তার বাহিনী নিয়ে জিব্রাল্টার প্রণালী পার হয়ে আইবেরীয়া পৌঁছান ৭১১ খ্রিস্টাব্দে। কয়েক মাসের মাঝেই তারিকের বাহিনী রাজা রডারিককে পরাজিত করে আইবেরিয়াতে মুসলিম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। আর তিন বছরের মাথায় গোটা আইবেরিয়া মুসলিমদের অধীনে চলে আসে। ভিসিগোথদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠা অনেক শহর মুসলিমদের ন্যায়বিচার ও সাম্যতার ব্যাপারে জানতে পেরে স্বেচ্ছায় তাদের শহরের দরজা খুলে দেয় এবং মুসলিমদের স্বাগত জানায়।

মুসলিমদের স্পেন বিজয়ের বহু দলিলাদি ও প্রমাণপত্র টিকে ছিল যা থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় এই বিজয়টি মোটেও জোর করে ধর্মান্তর করার উদ্দেশ্যে ছিলনা। ৭১৩ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে, সেখানকার এক মুসলিম গভর্নর এক ভিসিগোথের সাথে একটি চুক্তির মাধ্যমে মধ্যস্থতা করেন, যেখানে একটা বিধান ছিল যে স্থানীয় ব্যক্তিদের —

“হত্যা করা হবেনা কিংবা কয়েদী হিসেবেও নেয়া হবেনা। তাদেরকে তাদের নারী ও শিশুদের থেকেও আলাদা করা হবেনা। তাদের ধর্মীয় ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা হবেনা, তাদের গীর্জাও পুড়িয়ে ফেলা হবেনা।” (৩)

মুসলিম স্পেন (যা পরবর্তীতে ‘আল-আন্দালুস’ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠে) এর উদাহরণ থেকে আমরা দেখতে পাই যে স্থানীয় জনগণকে (যাদের বেশীরভাগই ছিল খ্রিস্টান, যদিও একটা বড় ইহুদি জনসংখ্যাও ছিল) ইসলাম ধর্ম গ্রহণের জন্য জোর করা হয়নি। বরং বাস্তবে এরপরের শতাব্দীগুলোতে আল-আন্দালুস সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতার উদাহরণ প্রতিষ্ঠা করে যেখানে মুসলিম, ইহুদি এবং খ্রিস্টান সবাই জ্ঞান, সংস্কৃতি ও দর্শন চর্চায় এক স্বর্ণযুগ অতিবাহিত করেছিল। ধর্মীয় সহিষ্ণুতার এই আলোকিত ভূমির শেষ হয় আরো কয়েক শতাব্দী পরে যখন ‘খ্রিস্টান রিকনকুয়েস্তা’ (খ্রিস্টানদের পুনর্দখল) এর মাধ্যমে যা গোটা আইবেরিয়া থেকে সাফল্যের সাথে মুসলিম ও ইহুদিদের জাতিগতভাবে নির্মূল করে।

হিন্দুস্তান ***

আজ বিশ্বের সবচেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম দু’টি হচ্ছে পাকিস্তান (২য়) এবং ভারত (৩য়)। এই দু’টি দেশ মোটামুটি গোটা হিন্দুস্তানজুড়ে ব্যাপৃত। এই অঞ্চলের জনমানুষের জীবনের সকল ক্ষেত্রেই ইসলামের এক অবিশ্বাস্য এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিমদের বিভিন্ন সাম্রাজ্য ও রাজবংশ দ্বারা শাসিত হলেও হিন্দু এবং অন্যান্য ধর্ম উপমহাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রয়ে গিয়েছে।

উপমহাদেশে মুসলিমদের আক্রমণের ব্যাপারটা তখনকার যুদ্ধবিগ্রহের নিয়ম-কানুনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। শ্রীলংকায় বাণিজ্যিক কাজে নিয়োজিত থাকা মুসলিম ব্যবসায়ীদের কন্যাদের জাহাজে সিন্ধু (যা বর্তমানে পাকিস্তান) অঞ্চলের জলদস্যুরা আক্রমণ করে এবং জাহাজের নারীদের আটক করে দাসবৃত্তির কাজে নিয়োজিত করে। বন্দী নারীদের মুক্ত করতে এবং জলদস্যুদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে মুহাম্মাদ বিন কাশিম এর নেতৃত্বে ৭১০ খ্রিস্টাব্দে একটা অভিযান পরিচালিত হয়। মুহাম্মাদ বিন কাশিম ছিলেন আরবের তায়েফের অধিবাসী।

এতো দূরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মুহাম্মাদ বিন কাশিম এর সফল সেনা অভিযানের পিছনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল হিন্দুস্তানের চলমান খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু সামাজিক সমস্যা। হিন্দু ধর্মের একটি বিশ্বাস হচ্ছে বর্ণপ্রথা, যা সমাজকে বিভক্ত করে রেখেছিল খুবই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত কিছু সামাজিক শ্রেণীতে। উঁচু শ্রেণী ধন্যাঢ্য এবং আরামদায়ক জীবন যাপন করতো, অন্যদিকে নীচু শ্রেণীর সবাইকে (বিশেষ করে যারা অচ্ছুত নামে পরিচিত ছিল বা যাদের ছোঁয়া যেতোনা) দেখা হতো সমাজের অভিশাপ হিসেবে। সাথে ছিল বৌদ্ধ সম্প্রদায়, যারা গোটা দেশজুড়েই সাধারণত হিন্দু রাজপুতদের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে আসছিল। মুসলিমদের অনুপ্রবেশের পর তাদের প্রতি সামাজিক সাম্যের প্রতিশ্রুতির কারণে বেশীরভাগ বৌদ্ধ এবং নিম্নবর্ণের হিন্দু তাদের স্বাগত জানায়। বাস্তবে, হিন্দুস্তানের সর্বপ্রথম মুসলিমরা সম্ভবত নিম্ন বর্ণের হিন্দু ছিল, যেহেতু ইসলাম তাদেরকে মুক্ত করে পূর্ববর্তী অত্যাচারী সামাজিক ব্যবস্থা থেকে।

সিন্ধু বিজয়ের মাধ্যমে মুহাম্মাদ বিন কাশিম এটা দেখাতে সক্ষম হন যে ইসলামী শরীয়াহর সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারটা শুধু খ্রিস্টান কিংবা ইহুদিদের জন্যই নয়। উপমহাদেশের বৌদ্ধ এবং হিন্দু সম্প্রদায়কে জোরপূর্বক ধর্মান্তর করা হয়নি, বরং তাদের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দেয়া হয়। এক ঘটনায়, এক অঞ্চলের বৌদ্ধ সম্প্রদায় মুহাম্মাদ বিন কাশিম এর কাছে এই মর্মে তাদের আশঙ্কা প্রকাশ করে যে, মুসলিম বাহিনী হয়তো তাদের ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করবে এবং যার ফলে তাদেরকে তাদের পূর্বপুরুষের ধর্ম পালন করা বন্ধ করে দিতে হবে। এ অভিযোগ শুনে বিন কাশিম সেই শহরের বৌদ্ধ এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের কতিপয় নেতার সাথে বৈঠক করেন এবং তাদেরকে ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেন, এবং তাদের অনুরোধ করেন যাতে তারা তাদের জীবন ঠিক আগের মতোই যাপন করে যায়।

উপসংহার

আমরা আবার আর্টিকেলের শুরুর দিকে আরোপ করা প্রশ্নে ফিরে যাই, ইসলাম কি সত্যিই অস্ত্রের মুখে ছড়িয়েছিল? যখন অসংখ্য মানুষ রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় ইস্যুকে ব্যবহার করছে, তখন আমরা সন্দেহাতীতভাবে দেখতে পাই যে ইসলাম ধর্ম জবরদস্তি, বলপ্রয়োগ, ভীতি কিংবা রক্তপাতের মাধ্যমে ছড়ায়নি। কোথাও মানুষকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করা হয়েছে এরূপ কোন বর্ণনাই পাওয়া যায়না। মুসলিম নেতাদের রাজনৈতিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ-বিগ্রহের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করলেও, বাস্তবে তারা এই পথ গ্রহণ করেছিলেন অন্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষা করার জন্যে। মুসলিম বাহিনীর যুদ্ধ সবসময়ই ছিল সরকার এবং সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে, স্থানীয় জনতার সাথে নয়। যদিও এই আর্টিকেলে মুসলিমদের শুরুর দিকের প্রজন্মের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল বিজয়ের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে, পরবর্তী প্রজন্মের মুসলিমরা এই ধারা রেখে গিয়েছেন গোটা ইসলামের ইতিহাস জুড়েই।

এটা মনে রাখা জরুরী যে উল্লেখিত ঘটনাগুলো ছিল ধর্মীয় সহিষ্ণুতার ইতিহাসে প্রথম কিছু উদাহরণ। যখন ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং স্বাধীনতা পশ্চিমা সভ্যতায় সর্বপ্রথম দেখা গিয়েছিল ১৭শ এবং ১৮শ শতকের দিকে, তখন মুসলিমরা ধর্মীয় স্বাধীনতার চর্চা করে আসছে ৭ম শতক থেকে। ইসলামের বাণী উগ্রপন্থায় এবং যুদ্ধ-বিগ্রহের মাধ্যমে ছড়িয়েছে বলে তথাকথিত রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক ‘পণ্ডিতগণ’ যেসব যুক্তিতর্ক পেশ করে থাকেন তাদের এসব যুক্তিতর্কের কোন ঐতিহাসিক ভিত্তিই নেই। বরং বাস্তবে মুসলিমদের ধর্মীয় সহিষ্ণুতার এই চর্চা প্রভাবিত করেছিল ইউরোপ, আমেরিকা থেকে শুরু করে হিন্দুস্তানের মতো বৈচিত্র্যময় সব অঞ্চলের সংস্কৃতি ও চিন্তাধারাকে।

This article is issued from Wikipedia. The text is licensed under Creative Commons - Attribution - Sharealike. Additional terms may apply for the media files.